শাহারুল ইসলাম ফারদিন, যশোর প্রতিনিধি:
যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল পৌরসভার বড়আচড়া গ্রামে ব্যবসায়িক লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এক ব্যবসায়ীকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার (৫ জুন) রাত ১০টার দিকে সংঘটিত এ ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান সোহাগ হোসেন (৩৬) নামে ওই ব্যবসায়ী। জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। সোহাগ হোসেন বড়আচড়া গ্রামের মৃত হায়দার আলীর ছেলে। তিনি বর্তমানে নিজ বাড়িতে না থেকে একই গ্রামের চেকপোস্ট এলাকার মশিয়ারের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে সোহাগ হোসেন অফিস থেকে বাসায় ফিরে রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ১০ থেকে ১২ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল তার বাসার সামনে এসে অবস্থান নেয়। প্রথমে তারা উচ্চস্বরে গালিগালাজ ও হুমকি দিতে থাকে। পরে একপর্যায়ে দুর্বৃত্তরা ঘরের জানালা ও দরজা লক্ষ্য করে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলির বিকট শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রথমে শব্দটিকে ককটেল বিস্ফোরণ মনে করলেও পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলির চিহ্ন দেখতে পান। হামলাকারীরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়।
সোহাগ হোসেন জানান, তিনি ঘরের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। হামলাকারীরা বাইরে থেকে তাকে ডাকাডাকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা গুলি চালায়। একটি গুলি জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢুকে দেয়ালে আঘাত করে এবং পরে দরজার অংশ ভেদ করে বাইরে চলে যায়। আরও কয়েকটি গুলি জানালা ও ঘরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। তিনি বলেন, আমি যদি ওই সময় জানালার পাশে বা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম তাহলে হয়তো আজ বেঁচে থাকতাম না। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে হত্যা করা। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে একটি ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে আমি মনে করি। এলাকায় একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। পুলিশ সেগুলো পর্যালোচনা করলে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারবে।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তারা ঘরের জানালার কাচ ভাঙা, দরজায় গুলির চিহ্ন এবং আশপাশে পড়ে থাকা গুলির খোসা দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ করে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বড়আচড়া গ্রাম বেনাপোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। সেখানে রাতের বেলায় প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হামলার সময় আশপাশে নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজন অবস্থান করছিলেন। গুলিগুলো অন্য কোনো বাসা বা পথচারীর গায়ে লাগলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত।
একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করা হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
ঘটনার খবর পেয়ে বেনাপোল পোর্ট থানা পুলিশের একটি দল রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ব্যবহৃত গুলির খোসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেনাপোল পোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায় এবং আলামত সংগ্রহ করে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়িক লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ঘটনার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্তে একাধিক টিম কাজ করছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।